‘ওঃ! জল দেখেছিস? যেন পদ্মা নদী !
‘শশালা, পদ্মা নদী কোনওদিন চোখে দেখেছিস? বানান কর তো দেখি পদ্মা?” ‘পদ্মা তোর বাবার সম্পত্তি বে? বাংলাদেশ কোথায় একটা মাটির বাড়ি তুলে রেখেছে, সেই থেকে বাংলাদেশ যেন ওর প্রাইভেট প্রপার্টি।
‘মুখ সামলে, মুখ সামলে! মাটির বাড়ি মানে? জানিস, ফ্রিজ আছে, কালার টিভি, দোতলা—'
একহাতে নাকটা চেপে ধরে খ্যা খ্যা করে একটু গা জ্বালানো হাসি সুনন্দর গায়ের ওপর ছেড়ে দিল সিদ্ধার্থ।—‘গুরু, এবার শুনলে ঘোড়ায় হাসবে। সপ্তাহখানেক আগে বললি না, তোদের গ্রামে এখনও কারেন্ট যায়নি বলে অপোজিশন পার্টি আন্দোলনে নেমেছে?'
সুনন্দ একটা ঢোক গিলল, ‘না, মানে ব্যাপারটা বুঝছিস না। সেটা পাশের গ্রাম ছিল। ঝামেলাটা তো সেই নিয়েই, মানে, আমাদের গ্রামে পর্যন্ত কারেন্ট চলে এসেছে, কিন্তু এখনও পাশের গ্রামে
‘ওসব ঘাপলা ছাড়ো গুরু, আগের সপ্তাহের অন্ধকার গ্রামে এ সপ্তাহে টিভি এসেছে, সামনের সপ্তাহে মাধুরী দীক্ষিত আসবে, তারপরের সপ্তাহে— আই অ্যাই না, যা-আ-আ; শালা প্যান্টটার কী অবস্থা করলি?'
একহাঁটু জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে সিদ্ধার্থ রেগে গিয়ে অবিশ্রান্ত গালাগালির জন্য সবে মুখ খুলেছে, তার আগেই ইন্দ্রনীল লাফিয়ে এসে সিধুকে জড়িয়ে ধরে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে বলল – “সিধু, বাপ! বাড়িতে ধোপার লোক তোর প্যান্ট সাদা করে দেবে, কিন্তু আজকের দিনটার কথা ভাব। এমন দিনে লাফা না? সারাদিন বৃষ্টিটা কেমন হল বল? এ.কে.জি পড়াবে না, রাত নটা পর্যন্ত অবাধ স্বাধীনতা। আরে এক হাঁটু জল ভাঙার মজাই আলাদা রে। দেখেছিস রাস্তার মোড়ে মেয়েটাকে, কেমন ঝিলিক মারছে? ওরে সিধু এরকম দিন আর পাব না রে।' বলেই পর্বত প্রমাণ লাফ এবং আবার জল ছিটকে পড়ল বাকি দু'জনের মুখে।
‘আই, ইয়ার্কি হচ্ছে? আর একবার যদি এরকম লাফাস, আমি কিন্তু স্ট্রেট তোর বাড়িতে রাস্তা থেকে ফোন করব, যে আজ এস.কে.জি পড়ায়নি।'
সুনন্দের ঠোঁটটা নেড়ে দিল ইন্দ্র— ‘আমার ছত্যবাদী যুজিষ্টির! তা গুরু আমার বাড়িতে যদি জিজ্ঞাসা করে যে তুমি এখন কোথায়, তখন কী বলবে?'
‘আমি কি একবারও বলেছি যে নটায় বাড়ি যাব?'
‘বলিসনি মানে? দ্যাখ সোনা, যদি না যাস, আমি আর ইন্দ্র চ্যাংদোলা করে তোকে জলে চুবিয়ে রাখব।'
‘শোন, এরকম সুযোগ কিন্তু আর পাবি না। ক্লাস কাটার আশা ছাড় এস.কে.জির শকুনের চোখ। ঠিক ধরে ফেলবে। আজকের দিনটা তো ফোকটে পাওয়া। কেউ কিছু বলার নেই। বাড়িতে জানবে না, অন্যরাও হচকাবে না, আমি সবাইকে সাইজ করে এসেছি।'
‘আমার যেতে তো কোনও আপত্তিই নেই। কিন্তু তখন ইন্দ্ৰ অত চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডিপার্টমেন্টের সামনে বলছিল, এস.কে.জি যদি শোনে—চারদিকেই তো ওর চামচে।'
“ওই দ্যাখো, কুড়ি পেরিয়ে একুশ হতে চলল তো, নাকি? এখনও ভয়? তা ছাড়া শুনলেই বা কী? কী করবে? আজ তো ভালো অজুহাত আছেই—বৃষ্টি। রাস্তায় আটকে গিয়েছিলাম বলব। আর আমাদের পেছনে কাঠি করা ছাড়াও এস.কে.জি-র আরও অনেক কাজ আছে।' সিদ্ধার্থ প্যান্টটাকে হাঁটুর ওপর গুটিয়ে নিল।
ইংলিশ অনার্সের শুভদীপ পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল— ‘তোরা কিন্তু ভুলেও কলেজস্ট্রিট চত্বরে যাস না, এস.কে.জি ওদিকেই যাচ্ছে। এইমাত্র ট্যাক্সিতে উঠল।'
‘কলেজস্ট্রিটে যাবে তোমার মতো আঁতেলরা। তুই যেতে পারিস, দ্যাখ গিয়ে এই বর্ষায় কোনও মিলটন মারাতে পারিস কিনা।'
শুভদীপ গম্ভীরভাবে আকাশের দিকে চেয়ে বলল—‘আমি এখন বাড়ি যাব।' ‘ও হ্যাঁ, সামনে তো আবার প্রিটেস্ট, তাই বাজে ছেলেরা বাড়ি গিয়ে পড়াশোনা। আমরা বাবা ভালো ছেলে, একবছর আগেই সিলেবাস কমপ্লিট, এখন আমাদের রিল্যাক্স পিরিয়ড।'
শুভদীপ মুখ ফিরিয়ে কিছু একটা বলতে যেতেই টাল সামলাতে না পেরে ঝপাস করে পড়ল জলের মধ্যে। ফলে আবার একপ্রস্থ হাসি, চিৎকার, গালাগালি । সিধু বুট-পরা পায়ে জলের মধ্যে লাথি মারতে মারতে এগোচ্ছিল। একবার জলের ঝাপটা গিয়ে লাগল এক মহিলার মুখে। তিনি মুখে আঁচল চাপা দিয়ে বিড়বিড় করে বলতে বলতে গেলেন—‘এরা আবার ভদ্র, কলেজে পড়াশোনা করে।'
সুনন্দ সিদ্ধার্থ আর ইন্দ্রনীল বড়ো রাস্তায় পড়বার মুখে কেমিস্ট্রির কৌশিক বলে গেল—‘তোদের বাড়িতে ফোন করছি।'
তাহলে তোর বাড়িতেও একটা রিটার্ন কল যাচ্ছে, আর তোর বাবা এমন গালাগালি খাবে যে কান থেকে রক্ত পড়বে।'
বাসস্ট্যান্ডে এসে সুনন্দ বলল— ‘কোথায় যাবি?’
ইন্দ্র ঘড়ি দেখল, ন'টার মধ্যে উঠলে দশটায় বাড়ি পৌঁছনো যাবে, মানে মেট্রো স্টেশনের কাছাকাছি কোনও জায়গা।
‘লেকে?’
‘সন্ধেবেলা তুলে দেবে।’
‘তা হলে গাঁজা পার্ক ।”
‘মাল খাওয়া যাবে না।'
‘ভিক্টোরিয়া যাওয়া যেতে পারে।’
‘কলকাতায় থাকিস না নাকি? জানিস না সন্ধেয় গেট বন্ধ করে দেয়?” ‘তা কোনওকিছুই তো তোর পছন্দ হচ্ছে না। তাহলে কোনও বারে যাই।' ‘বোকার মতো কথা বলিস না সোনা। এই ভেজা জামাপ্যান্টে বারে? আর পকেটে মালকড়ি কত আছে যে অতক্ষণ বসব? ঘাড় ধরে বার করে দেবে।' সিধু এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। হঠাৎ বলে উঠল—‘ময়দান চল।’ বাকি দু'জন চমকে উঠে ওর দিকে তাকাল। সাদা মুখে বিড়বিড় করে বলল সুনন্দ—‘আবার ময়দান? আমরা বলেছিলাম যে আর—
সিধুর দিকে স্থির চোখ রাখল ইন্দ্র—‘নিজেকে হিরো দেখাতে চাস ?'
সিদ্ধার্থ ধীরে ধীরে বলল, ‘যেটা হয়ে গেছে, হয়েই গেছে। একটা অ্যাক্সিডেন্ট হিসেবেই ব্যাপারটাকে নে না। দ্যাখ, তখন আমরা তিনজনেই ইনটক্সিকেটেড ছিলাম। তাই বলছি, গোটা ঘটনাটাকে তো একটা মাইল্ড এরর হিসাবেও দেখতে পারি। আর এত ভয় কিসের? অন্তত ভয় ভাঙানোর জন্যও ওখানে যাওয়া দরকার। ' সুনন্দ ঠোঁটের ওপর জিভ বোলাল— ‘কাজটার জন্য এখনও আমার খুব অপরাধী লাগে নিজেকে।'
‘তুই কি খুন করেছিস? না ডাকাতি? একটা জন্তু হয়তো বা পাগলই— ‘কিন্তু এখনও মাঝে মাঝে রাতে ঘুম ভেঙে যায় ভয়ে।’ ‘বুলশীট।’ সিদ্ধার্থ উল্টে দিকে হাঁটা শুরু করল।
‘সিধু শোন।’ হাত ধরে টানল ইন্দ্র।
‘চলে যাচ্ছিস?’
‘কী করব, কাওয়ার্ডদের সঙ্গে আমাদের মেলে না।' সিধু উদাসীনভাবে চাইল আকাশের দিকে, ‘মেঘও করেছে খুব, আমি বরং বাড়িই যাই। তোরা কোথায় যাবি যেন— ভিক্টোরিয়া না? যেতে পারিস।'
‘আমরা কাওয়ার্ড?'
‘তুই নিজেকে সেটা নাও ভাবতে পারিস।'
ইন্দ্ৰ দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে কী যেন ভাবল, তারপর সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে এরকম ভঙ্গিতে বলল হঠাৎ—‘অল রাইট, ময়দান।'
সুনন্দ ভীত চোখে তাকাল, ‘আমার ভয় করছে।‘
‘সেজন্যই তো আরও যাব। এই ভয়টাই কাটানো দরকার। '
‘অন্য কোথাও যাওয়া যায় না?’
‘না ৷’
‘সেদিনও কিন্তু এরকম বৃষ্টিরই দিন ছিল।'
‘তোর অসুবিধে থাকলে তুই বাড়ি যেতে পারিস।'
সুনন্দ একটা নিঃশ্বাস ফেলল——কোনওদিন কি তোদের ফেলে গেছি? বলছিস, চল। কিন্তু ফলাফলের দিকটাও ভেবে রাখিস।'
‘কি পাগলের মতো বকছিস? ফলাফল মানে? হ্যাঁরে, তোর কথায় হাসলে তো আবার রেগে যাবি। বস্তাপচা হরর ফিল্মগুলো দেখলে ওই হয়। সিধু, মাল কিনবি কোথা থেকে?”
‘পার্কস্ট্রিটে তো অনেক দোকান । আর একটা বড়ো বোতল, কোক। তিনজনের কাছ যা টাকা আছে হবে না?'
তিনজনে যখন ময়দানের সেই পরিচিত গাছটার তলায় কাগজ বিছিয়ে বসল, তখন ঘড়িতে যদিও সবে ছ'টা, কিন্তু আকাশ মেঘে মেঘে অন্ধকার। ঝোড়া হাওয়া, আর তার সঙ্গে বৃষ্টির ফোঁটা। ডান পাশটায় বড়ো বড়ো জঙ্গল, টাটা সেন্টারের মাথাটা অল্প দেখা যাচ্ছে। সারা মাঠ জলে ভাসছে। জনহীন নীরব অন্ধকার, যেন প্রাচীন যুগের কোনও বধ্যভূমি।
ইন্দ্র কোক আর ভদকা মিশিয়ে বোতল ঝাঁকাতে লাগল, সিধুর গলায় গুনগুন করে গান। সুনন্দই শুধু ঝিম মেরে আছে।
বোতলটা সুনন্দর দিকে ইন্দ্র এগিয়ে দিল—‘নে, তুইই শুরু কর।'
সুনন্দ গলায় বোতলটা ঢালতে গিয়ে হঠাৎ চমকে উঠে বলে— ‘বেড়াল।’ “অ্যাঁ?’
‘একটা বেড়ালের ডাক—শুনলি?’
সিদ্ধার্থ হো হো করে হেসে উঠে একটা থাপ্পড় মারল সুনন্দর পিঠে——সে কি রে, নেশা না হতেই বেড়াল ডাকে? তা জ্যান্ত বেড়ালটাকে দেখছিস না, ইঁদুরের পেছনে ছুটছে?'
রেগে উঠল সুনন্দ—‘সবসময় জোক ভালো লাগে না। আমি শুনেছি, আর সেটাই ফাইনাল। তোরা কি ভাবিস, আমি ভীতু ? এটা আমার একটু নিতে অসুবিধে হয়, কিছু মনে করিস না।'
‘যাঃ শালা, এত সিরিয়াস হয়ে যাচ্ছিস কেন? আরে একটু ইয়ার্কি করলাম আর—'
‘বললাম তো, সবসময় ইয়ার্কি হয় না। এখন আমি যদি তোকে ইনসেনসিটিভ বলি, তুই সেটাকে আমার ভয় হিসাবে ধরবি। কিন্তু প্লিজ, এখনও আমার কাছে ব্যাপারটা অত লাইট হয়নি।'
ইন্দ্ৰনীল এতক্ষণ মিটিমিটি হাসতে হাসতে শুনছিল, এবার বলে উঠল— ‘আঃ সিধু। তোর সত্যিই উচিত হয়নি ওরকম করা। তুই জানিস সোনা খুব সেনসিটিভ, কবি তো! কবিরা ওরকম হয়। হ্যাঁরে, তুই অর্পিতাকে নিয়েও তো কবিতা লিখেছিস না ?’
একটু চমকে উঠল সুনন্দ, ‘তুই কী করে জানলি?”
মুচকি হেসে ইন্দ্র বলে, ‘ধরে নে তুই-ই বলেছিলি।'
হা হা করে হেসে ওঠে সিদ্ধার্থ—‘সোনা তুই একটা রামপাঠা! ও বলল, আর তুইও বিশ্বাস করলি? ও অন্ধকারে ঢিল ছুঁড়েছে বুঝলি না?'
ইন্দ্র হেসে ফেলে, ‘বছর দুই আগে একবার এরকমই এক প্রচণ্ড বৃষ্টির সন্ধেবেলায় ময়দানের ভেতর দিয়ে ছুটেছিলাম। সেই অনুভূতিটা ঠিক বোঝাতে পারব না। ভুতের মতো মাঠটা যেন হাঁ করে গিলতে আসছে, দূরে ভিক্টোরিয়ার পরী ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে, একবার পা স্লিপ করে পড়েও গেলাম—কাদামাখা চেহারা —বড়ো বড়ো গাছগুলোর দুলুনি দেখে মনে হচ্ছিল ভেঙে পড়বে। সেই সময়ে মনে হয়েছিল, কবিতা লিখতে পারলে বেশ হত।'
সুনন্দ বোতলটা বাড়িয়ে দিল ইন্দ্রর দিকে, ‘নে, খেলে কবিতা আসবে।' সিদ্ধার্থ বলে—‘তোর মতো নয় যদিও তবে আমারও এখানে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল। একদিন সন্ধেবেলা মাল খেয়ে ফিরছি, কি মনে হল, ভাবলাম ময়দানের মাঝ বরাবর হেঁটে যাই। বেশ ভালো লাগছিল, বুঝলি। শীতকাল। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। দূরে টাটা সেন্টারের ওপর একমাত্র আলো। হাল্কা কুয়াশার একটা সাদা চাদর মাঠে ছড়ানো। জীবনদীপের দিকে কোনাকুনি এগোচ্ছি, হঠাৎ কানের কাছে কে যেন চিৎকার করে উঠল, ‘সরে দাঁড়া।' মাতাল হয়ে এমনই অন্যমনস্ক ছিলাম যে বুঝতেও পারিনি কাছাকাছি কেউ আছে। চমকে চেয়ে দেখি একটা পাগল। বিশ্বাস করবি না, ডিসেম্বরের শীতেও খালি গা, একটা আধময়লা ন্যাকড়া কোমরে। আমার দিকে চেয়ে আবার চেঁচিয়ে উঠল, ‘সরে দাঁড়া’। প্রথমে ভাবলাম, পয়সা টয়সা দিয়ে দেব, কিন্তু তার আগেই চোখ বড়ো বড়ো করে বলে উঠল— “কীরে, ফুর্তি মারতে এসেছিস, না? দ্যাখ শালা ফুর্তি কাকে বলে।' বলে সটান কোমরের ন্যাকড়াটা খুলে ছুঁড়ে দিল। অবস্থাটা ভাব। অন্ধকার মাঠে আমি একা, সামনে দিগম্বর পাগল, যেন মহাকালকেই দেখছি। হাঁ হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, হঠাৎ পাগলটা হা হা চিৎকার করে দু'হাত বাড়িয়ে সামনের ঝোপের দিকে ছুটে গেল। যেন, হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। ওই হাহাকার করে দু'হাত বাড়িয়ে ছুটে যাওয়া— অদ্ভুত। পরে অনেকদিন এখানে এসেছি, আর দেখিনি।'
সিদ্ধার্থ একসঙ্গে অনেকটা মদ গলায় ঢেলে সুনন্দের দিকে ফেরে— ‘সোনা, আমরা বেড়াল-পরবর্তী এপিসোডে কবার ময়দানে এসেছি?'
‘একবারও না। কেন?'
‘কেন আসিনি? ভয়?’
‘ঠিক সেটা নয় রে সিধু! আমি পুরোটা বোঝাতে পারব না। কিন্তু সেদিনও এরকম বৃষ্টি পড়ছিল। সারা ময়দান জলে ডুবেছিল—আধ হাঁটু জল। আমরাও এই উঁচু গাছতলাতেই, হয়তো পুরোটাই আমার কল্পনা, কিন্তু আমি ফিলিংসটাকে ঠিক তাড়াতে পারছি না। হয় তো সংস্কার।
সিধু সুনন্দের মুখটা লক্ষ করে—মুখটা ফ্যাকাশে লাগছে। সুনন্দ ঠোঁটের ওপর জিভটা বোলাচ্ছে বারে বারে।
‘তুই কি ভয় পাচ্ছিস?'
সুনন্দ অন্যমনস্কের মতো তাকায়— ‘ভয়? পুরোটা ভয় নয়। আসলে আমার অপরাধী লাগে নিজেকে। আমরা একটা হিংস্র কাজ করেছি, সেটা স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে করতাম না। ব্যাপারটা কেমন বল তো? আজ থেকে বছর দশেক আগের কথা। তখন ক্লাস সেভেন কি সিক্স। প্রত্যেক রবিবার একটা ভিখিরি আসত আমাদের বাড়ি। আমিই পয়সা দিয়ে আসতাম। সেই দিনটায় ও দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে, আমি দিতে যাচ্ছি, তা হাত থেকে পয়সাটা পড়ে গেল। কুড়িয়ে নিয়ে ওর হাতে তুলে দিলাম। ও-ও নমস্কার করে এগোচ্ছে, আমিও দরজা বন্ধ করব, হঠাৎ একটা বীভৎস আওয়াজ হল বাইরে, আর সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামেচি। দরজা খুলে দৌড়ে বাইরে গিয়ে দেখি, রাস্তা পেরোতে গিয়ে ভিখিরিটা লরির তলায় চলে গেছে। তুই চিন্তা কর, আমার হাত থেকে পয়সাটা যদি না পড়ত, ও কিন্তু অনেক আগেই রাস্তা পেরিয়ে যেতে পারত। ওই সময়টুকুর জন্য খুব কেঁদেছিলাম, জানিস! আসলে ছোটো ছিলাম তো। পরে বুঝেছি ওতে আমার কোনও হাত ছিল না। কিন্তু এইটা? এটা কী করে—
ইন্দ্র ততক্ষণে অনেকটা মাতাল হয়ে গেছে। চিৎকার করে বলে, ‘স্টপ ইট, স্টপ ইট। যুদ্ধ নয় শান্তি-শান্তি। কোনও দুঃখের কথা নয়—'
সুনন্দ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এইভাবে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ওদের নেশাও চড়তে লাগল দ্রুত। সিদ্ধার্থ একসময় নেশার ঘোরে ইন্দ্রর কোলে গড়াগড়ি খেতে লাগল—‘কেউ মাধুরীর ফ্যান ক্লাবে—কেউ চাকু হাতে চমকাবে, কেউ চাকু হাতে ফ্যান ক্লাবে, কেউ মাধুরীকে চমকাবে, কেউ—
ইন্দ্র জড়ানো স্বরে বলল—‘সিধু বাবা, আর টেনো না। বাড়ি ফিরতে হবে।' ‘বাড়ি? হ্যাঁ বাড়ি, বাড়ি ফিরব, মাই সুইটেস্ট লাভলি হোম, মাই সোনা, তোর বাড়ি ফুটপাত থেকে ক স্টেপ?'
“আঃ!’
‘আজ গুনবি। আমি বলছি একশোর বেশি তুই-না না; আমিই বলব একশোর কম—তুই—’
সুনন্দ ঝিম সুরে মাথা দোলাতে দোলাতে বলতে শুরু করল –‘অঞ্জনা নদীতীরে খঞ্জনী গাঁয়ে, রঞ্জনা নদীতীরে গঞ্জনা গায়, গঞ্জনা নদীতীরে সঞ্জনী গায়—'
ইন্দ্র জড়িত স্বরে বলতে লাগল, ‘রিয়া আমাকে ছেড়ে দিল। ওর পেছনে কত খরচ—না, ওকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম। আর দ্যাট স্কাউড্রেল ইঞ্জিনিয়ারটা— ওকে আমি খুনই করব, হ্যা খুন–ধুস্ শালা, মাল খেলেই কেন যে রিয়ার কথা মনে পড়ে।’
সিধু চোখ বুজে অনেকটা আপন মনেই বলল, ‘রিয়ার সঙ্গে শুয়েছিলি?” ইন্দ্র নেশার মধ্যে যেন চমকে উঠল একটু, ‘শুয়ে? না ওসব কিছুই হয়নি, কিন্তু ঘুরেছিলাম, অনেক, নিকো পার্ক অ্যাকোয়া—'
‘ইঞ্জিনিয়ার শুয়েছিল'
ইন্দ্র দু'হাতে মাথার চুল ধরে ঝাকাতে ঝাকাতে বলতে লাগল——আই নো, আই নো, যদি হাতের কাছে পাই তবে গলাটা কেটে দেব। আমি, আমি ইন্দ্রনীল, বুঝলি? যা চাই আমি তাই পাই। দরকার হলে রিয়াকে কিনে নিতে পারি— জানিস ? আমার বাপের প্রচুর কালো টাকা, আমি কিনে নেব, ইয়েস কিনে নেব, আমি—
‘টু বী অর নট টু বী—কে বলেছিল রে?' ‘শেক্সপিয়ার মনে হয়। কেন?'
সিধু একটা হাই তুলল, ‘নাঃ এমনি।’
“তুই বিশ্বাস করলি না আমি রিয়াকে কিনতে পারি? ওকে ওকে, বেট ? হাজার টাকা, না না, দশহাজার, না থাক, যদি আমি জিতি, যদি জিতি, রিয়া আমার। আর যদি হারি তোকে দিয়ে দেব, তুই ফুর্তি কর।
‘না।’
‘না কেন? আই অবজেক্ট আই অবজেক্ট। তোকে নিতেই হবে, তোকে দিয়ে দেব, সত্যি! না, টাকা লাগবে না। না, ফেয়ার প্লে, তুই নিবিই, প্লীজ — ধুস শালা, মাল খেলে রিয়া আসে কেন?'
সিধু চোখ বুজে গাছে হেলান দিয়ে বসে থাকল আর ইন্দ্র ওর দুই গালে হাত রেখে কান্না কান্না স্বরে বলতে থাকল— ‘সিধু তুই আমার এত বন্ধু, তুই, নিবি না? আমি তোকে দিয়ে দিচ্ছি—না, আই অবজেক্ট--'
সিধু চোখ বুজেই আত্মগতভাবে বলে ওঠে, ‘ভয় রে ভয়, সারাজীবন শালা ভয়। যেদিন দাদার বডিটা নিয়ে এলাম, বউদির সামনে দাঁড়াবার মতো ভয় জীবনে পাইনি। আর বউদি? সে মহিলা এক বাক্স গয়না পরে হেসে হেসে সবাইকে বলছে, ‘দিদি, ভোগে চলে গেল, ভোগে। সে মহিলার সামনে যেতে পারছি না, উন্মাদ কি সুস্থ লোকের কথা শুনবে? ওঃ, দাদার বডি দেখে বউদির কী হাসি। ওই ভয়—বুক শুকিয়ে যায়—ধুর, দুঃখের গল্প আর ভালো লাগে না মাইরি!'
হঠাৎ মাথার ওপর থেকে একটা রাতপাখি বিশ্রী কাঁ কাঁ শব্দ করে ডানা ঝেড়ে উঠল। সুনন্দ বিদ্যুৎস্পৃষ্টের মতো ইন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে গোঙানি দিয়ে উঠল——বেড়াল।’
‘বেড়াল? কার? ও বেড়াল, তুমি কার?'
‘মনে আছে, বেড়ালটাকে চুবিয়ে মারার সময় শেষদিকে এরকম আওয়াজ দিয়েছিল?
সিধু যেন ঘুমের ভেতর থেকে উঠল—‘বেড়াল? ওঃ সেই বেড়ালটা। মরে গেছে। মরেছে, বেশ হয়েছে। কতদিন হল রে? ছ মাস না?”
সুনন্দ মড়ার মতো মুখ করে বলল—‘আমার খুব ভয় করছে। এই আওয়াজটা, ঠিক বেড়ালটার মতো, ঠিক –
‘এই জায়গাটাতেই মেরে ছিলাম না?'
‘বেড়ালটা, জায়গাটা, সব এক।' ইন্দ্ৰ বলে—‘জানিস সোনা, বেড়ালটার সঙ্গে ওই হারামজাদা ইঞ্জিনিয়ারটার মুখের খুব মিল ছিল, ঠিক—'
সিধু ঘোরের মধ্যে বলে চলল, ‘চোখদুটো ধ্বক ধ্বক করে জ্বলছিল, তাই না রে? এখানেই তো এসেছিল; মাঠ— হ্যাঁ, মাঠ পেরোচ্ছিল মনে হয়। কি যে হল, যেন খুন চেপে গেল মাথায়। সেদিন কত খেয়েছিলাম রে? চার পেগ? না, না, চল্লিশ পেগ? অ্যাঁ, চারশো? না, আরও—'
সুনন্দ ঢোঁক গিলে বলল, ‘শীতকালের বৃষ্টি কনকনে ঠান্ডা জলে তিনজনে মিলে ঢুকিয়ে রেখেছিলাম’, সুনন্দ কেঁপে ওঠে— ‘শেষটায় নাক মুখ থেকে কালো কালো কি সব বেরিয়ে এসেছিল, আমার ডান কনুইয়ের কাছে লেগে গিয়েছিল, এই যে—'
হঠাৎ সুনন্দ একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল, ছাইসাদা মুখ থেকে চোখ দুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। অবর্ণনীয় আতঙ্কের সঙ্গে বাকি দু'জন দেখল সুনন্দর কনুই বেয়ে নেমে আসছে একটা কালো রঙের তরল।
মিনিটখানেক বাকরুদ্ধ হয়ে রইল তিনজনেই। সুনন্দকে দেখে মনে হচ্ছে ও এক্ষুনি অজ্ঞান হয়ে যাবে। ইন্দ্র ঠকঠক করে কাঁপছে, গলা শুকিয়ে কাঠ।
সবচেয়ে আগে সিধুই নিজেকে সামলে নিল। বিপদে ওর মাথা খোলে। ঝট করে সুনন্দের হাতটা নিজের কাছে টেনে নিয়ে দেখে শ্বাস ছাড়ল—“ওঃ, হাতটা কাটলি কি করে? মাঠের ভেতর একবার পড়ে গিয়েছিলি—কাঁচ ফাচ ছিল না কি?' ইন্দ্রও সিধুকে দেখে নিজেকে ধাতস্থ করে নিয়েছে ততক্ষণে— 'হ্যাঁ, ভেজা হাত কাটলে অনেক সময় বোঝা যায় না।’
তিনজনেরই নেশা ছুটে গেছে। সুনন্দ ভূতগ্রস্তের মতো ওদের দিকে চাইল—‘কাঁচ? না কাঁচ নয়, তোরা কী পাগল? আমি বুঝব না কাটলে ? এটা ওই—' ‘সোনা তুই পাগল হয়ে যাচ্ছিস পাগল। এই দ্যাখ তোর কনুইয়ের নীচে কাটা । তোর হাত কাঁচে কেটেছে। সোনা আমার দিকে তাকা, মরা জিনিস জ্যান্ত হতে
পারে না, আমি বলছি পারে না। তুই এর আগে হাত কাটিসনি?'
‘রক্ত শুকোয়নি। '
‘তুই আজ পড়ে গিয়েছিলি।'
‘কালো রক্ত লেগেছিল।'
‘মাঠে প্রচুর কাঁচ ছিল।'
‘আমি রাতে ঘুমোতে পারিনি। '
“সেই কাঁচে তোর হাত কেটেছে।'
‘বেড়ালটা এদিকে এগিয়ে আসছে।’
‘মরা লোক বাঁচতে পারে না। তোর কাঁচে হাত কেটেছে—'
‘সারা মাঠে রক্ত ছিল!'
ইন্দ্র সুনন্দর গলা দুহাতে টিপে ধরল—‘বল কাঁচে তোর হাত কেটেছে, বল তুই ভয় পাচ্ছিস না। বল কোনও রক্ত নেই, কোনও কিছু নেই। না হলে তোকে খুন করে ফেলব! বল বল – '
সুনন্দর গলা দিয়ে আওয়াজ বেরচ্ছে না। সিধু হাঁ করে ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে। অতিকষ্টে খ্যাসখ্যাসে স্বরে সুনন্দ বলে—‘বেড়ালটাকে কেন মেরেছিলাম রে?”
ইন্দ্রনীল এক ঝটকায় ছেড়ে দিল সুনন্দকে। জ্বলন্ত চোখে তাকিয়ে হিসহিসে চাপা স্বরে বলল— ‘জানিস না কেন? বেড়ালটাকে ওই ইঞ্জিনিয়ার কুত্তাটার মুখের মতো দেখতে বলিনি? আমি ইন্দ্রনীল, আমি যা চাই তা পাই, যা চাই—রিয়া— জানিস না তোরা? আমি বেড়ালটার ঘাড় মুচড়ে ছিড়ে নিতাম! ও রিয়াকে, রিয়া আজকাল ওর সঙ্গে ঘোরে, ওর সঙ্গে শোয়! ওর মুখটা ওরকম ভোঁতা, আর হাঁটলে নাকি পায়ের শব্দ হয় না। শুয়োরের বাচ্চা! বেড়ালটাকে মেরেছি, মেরেছি বেশ করেছি। এবার ইঞ্জিনিয়ারটাকে মারব। আমি যা চাই—বেশ করেছি। তা তোরা যদি এত মহত্ত্ব মারাস, তোরা মারলি কেন? লজ্জা করে না বলতে?'
সিধু ঘোরের মধ্যে বলে উঠল—‘আমিও—আসলে খালি মনে হচ্ছিল অন্যরকম কিছু করি, অন্য একটা কিছু। তার কিছুদিন আগে আমাদের পাড়ায় একটা পলিটিকাল মার্ডার হয়েছিল। ভারী কোনও পাথর দিয়ে মুখটা থেঁতলে— সেই মবিডিটি দেখে কিরকম অসাড় হয়ে গিয়েছিল মনটা। তারপর অনেকদিন রক্ত দেখে কিছুই মনে হয়নি। তখন মনে হতো একটা ধাক্কা দেবার—সবকিছুকে— আমার এক দাদা সাহিত্য টাহিত্য মারায়, ওর কাছে একটা বইয়ে লেখা ছিল, ‘প্রতিষ্ঠান ধ্বংস কর, ক্ষমতার সদর দপ্তরে কামান দাগো।' খুব মনে ধরেছিল কথাটা, যদিও বুঝিনি কিছুই। ভাবতাম, একটা আঘাত দেবার, যে কাউকে। এই জীবনটা অসহ্য ছিল। রোজ বাড়িতে বাবা মার অশান্তি, সকালের বাজার, রান্না, চেঁচামেচি, মাস মাইনের হিসেব, ফর্দ, খবরের কাগজ ও... দু'হাতে মাথা ঢেকে বসে পড়ল সিধু, ‘আই হেট দ্যাট লাইফ! এরই মধ্যে ওই মার্ডারটা—আমার প্রথম কোনও মার্ডার দেখা, ওটা যেন একটা অন্যকিছু, যাকে সবাই ভয় পায়। ওই অন্য একটা কিছু আমাকে টানছিল, এই জীবনটাকে একটা ধাক্কা দেওয়া, ওখান থেকে পালাতে গিয়ে—বেড়াল—হ্যাঁ, ওই বেড়ালটা—যেন সব পালানো ওর মধ্যেই ঢেলে দিলাম—সব মার—সব প্রতিশোধ—জানিস, বেড়ালটাকে মেরে কেমন যেন ফাঁকা লাগছিল ভেতরটা। কে যেন কানের কাছে ফিসফিস করছিল, সব পালানো শেষ। আবার ওই লাইফে ফিরে যাও, নতুন করে পালাতে চেষ্টা কর।’
ইন্দ্ৰ চোখ বুজে বসে পড়ে হাঁপাতে লাগল—‘আমাদের দিকে চেয়েছিল ধ্বক ধ্বক চোখে। মাথায় রক্ত উঠে গেল। দৌড়ে গিয়ে জাপটে ধরে জলে ডুবিয়ে দিলাম। হাত পা ছুঁড়ছিল—তখন তোরা আসলি।
সুনন্দ বোকার মতো তাকায়, আমারটা শুনবি? তোদের দেখে। তোরা দু'জনে যখন বেড়ালটাকে চুবিয়ে দিলি, তোদের মুখটা কেমন পাল্টে গেল। অজস্র ফাটল, অন্ধকার গুহার মতো দুটো চোখ, বেড়ালটার মতোই জ্বলছিল। দেখে আমার ভেতর কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল। যেন একটা রক্তের নেশা, আমি পাগল হয়ে উঠলাম। তোদের দেখে মনে হল, তোরা একাই গোটা রক্তের স্বাদটা নিবি? আমি কিছুই পাব না? হতে পারে না। মনে হল, আমি রক্ত চাই, রক্ত দেখতে চাই, রক্তের গন্ধ পেতে চাই, সারা মুখে রক্ত মাখতে চাই। তাই গেলাম—কেন গেলাম রে?”
আবার সবাই বসে পড়ে, কেমন যেন নেতিয়ে। এক ঝলক ঝড়ের হাওয়া কালো কালো গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যায়। সারা মাঠে একটা দমবন্ধ নৈঃশব্দ। মাথার ওপর দিয়ে শিস দিতে দিতে একটা কালো রঙের পাখি উড়ে যায়। মনে হয় প্যাঁচা।
একটু পরে সুনন্দ বলে, ‘ইন্দ্র, আমার হাত কী করে কাটল?'
‘জানি না।’
‘আমার কোনও যন্ত্রণা নেই কেন? '
‘জানি না।’
সিধু বলে ওঠে, ‘সোনা, তোকে আমিই প্রথম বি.এফ. দেখিয়ে ছিলাম, না ? ' ‘নেকেড মেয়ে দেখে ভয় লাগে না? এদিকে রক্ত দেখে ভয় লাগে, তাই না? নিজেকে দেখিস? নিজেকে দেখে ভয় লাগে না?
‘স্টপ ইট।’
সিধু চুপ করে যায়। বোতলে সামান্য কিছুটা পড়ে ছিল, দু'হাতে, সেটাকে জাপটে ধরে ঢকঢক করে খেয়ে মুখ মুছে বোতলটা লক্ষ্যহীন ভাবে ছুঁড়ে দেয় অন্ধকারে। কোথায় একটা ঝপাস করে শব্দ হয়।
ইন্দ্র চোখ বুজে বলে, ‘সুনন্দ, তোর থেকে আমি বেশি ভয় পেয়েছি।' ‘জানি।’
‘কি করে জানলি?
‘তুই যখন আমার গলা টিপে ধরলি, তখনই ।'
একটুক্ষণ চুপ করে থেকে ইন্দ্র আবার বলে, ‘গত দু’মাস ভয়ে আমি ভালো করে ঘুমাতে পারিনি। সারাক্ষণ ভয় পেয়েছি। কীসের এত ভয়? একটা বেড়ালকে মেরে ফেলেছি বলে? নিজের ছায়া দেখে ভয়, নিজের মুখ দেখে ভয়, এমনকি নিজের চারপাশকেও ভয়। এই ভয়টা থেকে আমি এ জীবনে আর বেরোতে পারব না। হাহাকার শব্দে ঝড়ের বাতাস এসে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সিধু নিজের মনে বলে ওঠে—‘অন্য একটা কিছু করতে হবে—ভয়টাও কি অন্যরকম?'
হঠাৎ একটা আওয়াজ হয় অন্ধকার চরাচরে। আওয়াজটা খুব চেনা। সবাই কেঁপে ওঠে।
সিধু বলে—‘পাখি।’ ইন্দ্ৰ বলে—‘পাখি।'
সোনা চেয়ে থাকে।
গাছ থেকে একটা পাতা খসে পড়ে ইন্দ্রর পায়ে। ইন্দ্র অসাড় হয়ে যায়।
হাহা করে বয়ে যায় হাওয়া।
‘সিধু?’
‘উ?’
‘আমরা এত ভয় পাই কেন? সারা জীবন?’
‘জানি না।’
‘আমি কেন বলতে পারছি না যে মেরে বেশ করেছি?' ‘ভয়।’
‘কীসের ভয়?’
‘এমন একটা কিছুর, যা আমরা জানি না।'
সুনন্দ হঠাৎ থরথর করে কেঁপে ওঠে। ‘সেদিন বেড়ালটাকে ঠিক কটায় মেরেছিলাম খেয়াল আছে?'
ইন্দ্র একটু চুপ করে থেকে বলে, ‘আছে। ঘড়ি দেখেছিলাম। ন'টা সাত।' ‘এখন কটা বাজে রে?”
ইন্দ্র চোখের কাছে ঘড়ি নিয়ে আসে। তারপর থেমে যায়। 'নটা পাঁচ।’
‘ইন্দ্র, বেড়ালটা আসছে।'
'মানে?'
‘আমি শুনতে পাচ্ছি। আওয়াজটা বেড়ালটারই ছিল। শোন ভালো করে।' সিধু গুঙিয়ে ওঠে—‘বাজে কথা বলিস না।'
ইন্দ্র সিধুর হাত চেপে ধরে। সে হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা।
আবার হাওয়া একটা ঝাপটা দেয়। অন্ধকার জলভরা ময়দান দাঁড়িয়ে থাকে বধ্যভূমি হয়ে। গাছ থেকে একটা দুটো পাতা খসে পড়ে। ‘নটা সাতে বেড়ালটা আসবে।'
‘না৷’
‘বেড়ালটার নাকে মুখে কালো কালো—'
‘না।’
ইন্দ্ৰ চাপা গোঙানি দিয়ে ওঠে এবার।
সুনন্দ ইন্দ্রকে জড়িয়ে ধরে। রক্তহীন মুখে বলে— ‘শোন।’
হ্যাঁ, এবার তিনজনেই স্পষ্ট শুনতে পায়। কোনও ভুল নেই। একটা বেড়ালের ডাক— ঠিক একটা মানুষের মতো। কিন্তু ঠিক স্বাভাবিক নয়। একটা জলে ডোবা বেড়ালের যে রকম আওয়াজ হয়, অনেকটা সেরকম। অন্ধকারে দেখা যায় না । কিন্তু শোনায় কোনও ভুল নেই।
তিনজনেরই শিরদাঁড়া দিয়ে বরফের স্রোত বয়ে যায়। স্তব্ধ আতঙ্কে তিনজন চুপ করে থাকে।
কাছেই ছপছপ করে জল ভাঙার শব্দ হল।
হিসহিস করে হাওয়া রক্তের আঁশটে গন্ধ বয়ে নিয়ে এল।
কালো গাছ থেকে দুটো পাতা খসে পড়ল স্তব্ধ জলে।
সময় অপেক্ষা করছে।